স্টাফ রিপোর্টার:ঢাকার সাভার উপজেলায় দুস্থ ও এতিমদের জন্য সৌদি আরব থেকে আসা কোরবানির দুম্বার গোশত বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় থেকে দেয়া প্রতিটি কার্টন থেকে ১ থেকে ৩টি পর্যন্ত প্যাকেট গোশত কম পেয়েছে মাদরাসা ও এতিমখানাগুলো। এতিমদের জন্য আসা এই উপহারের গোশত বিতরণে এমন অনিয়ম নিয়ে অনেকের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৫ সালে সৌদি আরব সরকার কর্তৃক উপহার হিসেবে পাঠানো সাভার উপজেলার জন্য ৩৩ কার্টন দুম্বার গোশত উপজেলার ১৬টি এতিমখানা ও মাদরাসার মাঝে বিতরণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত বছরের ২২ অক্টোবর স্মারক (নং- ৫১.০১.০০০০.০১৫.২০.০৯৫.২৫.২৮৮) অনুযায়ী এই বিতরণ তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু বিতরণের সময় অধিকাংশ কার্টনের সিল ভাঙা এবং ভেতরে থাকা প্যাকেটের সংখ্যায় বড় ধরনের গরমিল ছিল।
অভিযোগ উঠেছে, প্রতিটি কার্টনের গায়ে স্পষ্ট করে ১০টি প্যাকেট থাকার কথা লেখা থাকলেও, মাদরাসা প্রতিনিধিরা কার্টন বুঝে নেওয়ার পর অনেকেই দেখেন সেখানে ৭ থেকে ৯টি করে প্যাকেট রয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি কার্টন থেকে ২ থেকে ৩টি করে দুম্বার গোশতের প্যাকেট কৌশলে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সরেজমিনে ৮টি মাদরাসা ও এতিমখানায় ঘুরে সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে গোশতের প্যাকেট কম থাকার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
রাজাশন দারুল উলুম এতিমখানার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রিন্সিপাল মাওলানা আব্দুল মান্নান পাটোয়ারী বলেন, আমাদের ১ কার্টন দুম্বার গোশত দেওয়া হয়। আমরা যখন গোশত নিতে যাই, দেখি কার্টন আগে থেকেই খোলা। কার্টনে ১০টি প্যাকেট লেখা থাকলেও আমরা পেয়েছি ৮ প্যাকেট। একই এতিমখানার প্রধান বাবুর্চি মোঃ সামসুল আলম বলেন, আমরা যে কার্টনটি পেয়েছি সেটি খোলা অবস্থায় পেয়েছি। কার্টনের গায়ে ১০ প্যাকেট গোশত উল্লেখ করা ছিল কিন্তু আমরা পেয়েছি ৮ প্যাকেট।
গাজীরচট দারুল উলুম মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রিন্সিপাল মুফতি ওমর ফারুক বলেন, আমাদের এতিমখানায় শিক্ষার্থী বেশি তাই আমাদের ৬ কার্টুন দিয়েছে। ৬ কার্টনে আমরা পেয়েছি ৫১ প্যাকেট। ছয় কাটুন থেকে ৯ প্যাকেট গোশত কম ছিল। আবার কয়েকটা কার্টন খোলাও ছিল।
আল জামিয়াতুল আরাবিয়া মহিলা মাদরাসা ও এতিমখানার শিক্ষক সাহেদ কারী ইমরুল বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানে ৫ কার্টন বরাদ্দ দেওয়া হয়। গোশতের কার্টন উপজেলা থেকে আনার সময় আমিও সাথে ছিলাম। ৫ কার্টনের মধ্যে কয়েকটা খোলা ছিল। কোন কার্টনে ৭ প্যাকেট, কোনোটায় ৯ প্যাকেট আবার কোনটাই ১০ প্যাকেট গোশত ছিল। অথচ প্রত্যেক কার্টনের গায়ে লেখা ছিল ১০প্যাকেট গোশত।
দারুল ইসলাম শিশু সনদের বোর্ডিং সুপার শহিদুল ইসলাম বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানে ৩ কার্টন সাথে আরও অর্ধেক কার্টন বরাদ্দ দেওয়া হয়। আমরা কোন কার্টনে ৮ প্যাকেট আবার কোনটায় ৯ প্যাকেট গোশত পেয়েছি। সাথে অর্ধেক কার্টনের জন্য দিয়েছে আরো ৪ প্যাকেট। কিন্তু কার্টনের গায়ে ১০প্যাকেট উল্লেখ রয়েছে। তাহলে ৩ কার্টন আর অর্ধেক কার্টন মিলে ৩৫ প্যাকেট গোশত থাকার কথা কিন্তু আমরা পেয়েছি ২৮ প্যাকেট গোশত।
আদর্শ ইসলামী মিশন ও রাহমানিয়া খানকা শরীফ ও এতিমখানার হিসাব রক্ষক আব্দুল গাফফার বলেন, আমরা ২ কার্টন দুম্বার গোশত পেয়েছি। দুই কার্টনে ২০ প্যাকেট দুম্বার গোস্ত থাকার কথা ছিল কিন্তু পেয়েছি ১৯ প্যাকেট। বিষয়টি আমরা তাৎক্ষণিক ফোনে জানিয়েছিলাম কিন্তু তারা বলেছে যেভাবে এসেছে সেইভাবেই বিতরন করা হয়েছে।
মারকাজুল উলুম আল ইসলামিয়া এতিমখানার শিক্ষক আব্দুল আহাদ বলেন, আমি যখন দুম্বার গোশত আনতে যাই তখন উপস্থিত অফিসার আমাকে ২ কার্টন গোশত দেওয়ার সময় বলে দিছে কার্টনের ভিতর কম-বেশি থাকতে পারে। পরে এতিমখানায় এনে ২ কার্টনে আমরা পেয়েছি ১৭ প্যাকেট গোশত। অথচ থাকার কথা ছিল ২০ প্যাকেট।
কালিয়াকৈর আলিমুদ্দিন শিশু সনদের শিক্ষক মোঃ ফেরদৌস জানান, আমরা ১ কার্টন গোশত পেয়েছি। যে কার্টনটি দিয়েছে সেটি খোলা অবস্থায় পেয়েছি। ভিতরে কয় প্যাকেট মাংস ছিল তিনি মনে করতে পারছেন না।
ইসলামী শিক্ষা সহায়ক সংস্থার চেয়ারম্যান মোঃ হাবিবুর রহমান বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্ধেক কার্টন বরাদ্দ দেওয়া হয়। অর্ধেক কার্টনে ৫প্যাকেট গোশত থাকার কথা কিন্তু আমাকে দিয়েছে ৪প্যাকেট গোশত।
তবে অনেকের ধারনা দুম্বার গোশতের কার্টন খুলে ইচ্ছামতো প্যাকেট সরিয়ে নিয়েছে।
এদিকে সরকারি ত্রাণের মালামাল, বিশেষ করে ধর্মীয় ও মানবিক উপহারের গোশত বিতরণে এমন নজিরবিহীন অনিয়মে বিষয়টি জানাজানি হলে সাধারণ মানুষের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেককে বলতে শোনাগেছে, এতিম শিশুদের মুখে দেওয়ার জন্য আসা খাবারেও যারা ভাগ বসিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
সাভার উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো: ফাইজুল ইসলাম বলেন, দুম্বার গোস্তের এ কার্টনটাতো আসে জেলা অফিস থেকে, জেলা অফিস থেকে আমাদেরকে ইনফর্ম করা হয়। তার আগে সমাজসেবা দপ্তর থেকে ইউএনও স্যারের পরামর্শে, তার নির্দেশে আমরা এতিমদের তালিকা নেই, কোন কোন প্রতিষ্ঠানে দিতে হবে। সেই প্রতিষ্ঠানের লোকজন সাভার মডেল মসজিদে দাঁড়িয়ে ছিলো গাড়ি যাওয়ার আগে। তাদের চোখের সামনেই গাড়ি গেছে, এরপর উপজেলা থেকে আমাকে বলায় তারপর আমি গেছি। তাদের সামনেই সবকিছু বিভাজন করা হয়েছে। তবে ইনকিলাবের এই ভদ্রলোক সাহেব যে নিউজ করেছে উনি বলছে প্রতিটা কার্টন এ ১০ প্যাকেট করে লেখা আছে। কার্টন এর কোথাও ১০ প্যাকেট লেখা ছিলো না। কার্টন যখন খোলা হইছে,খোলা বলতে কি দু’একটা কার্টন যখন ভেঙ্গে গেছে ওগুলা কাউন্ট করে দেখা গেছে কোনটায় ৭ প্যাকেট,কোনটায় ৯ প্যাকেট আবার কোনটায় ১০ প্যাকেট। সবগুলায় যে ১০ প্যাকেট থাকতে হবে বিষয়টা এরকম ছিলো না। আমার কাছে ভিডিও ফুটেজ আছে। ওইখানের সব ফুটেজ আমার কাছে আছে। এটা হান্ড্রেড পার্সেন্ট স্বচ্ছতা নিয়ে করা হইছে, আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতেছি।
এ বিষয়ে সাভার উপজেলা নিবাহী অফিসার মো: সাইফুল ইসলাম বলেন, এক বছর পরে এসে এটা প্রমাণ করাও কঠিন। প্যাকেট খুলে দেখছে কোনটায় ৭ টা দেখছে,কোনটায় ৯ টা,এতো পরে এসে এটা এখন প্রমাণ করাও কঠিন। তবে এটা সংখ্যা হিসেবে না হয়ে ওজন হিসেবেও হতে পারে! তবে যদি ওজন হিসেবে হয় তাহলে প্যাকেট কমবেশিও হতে পারে।
প্যাকেট খোলা থাকার বিষয়ে ইউএনও এ প্রতিবেদককে জানান,কার্টনতো খোলা থাকবে না, তবে আনার সময় দু’একটা প্যাকেট ড্যামেজ হতে পারে। কার্টনতো খোলা থাকবে না। এ সময় তিনি আরও জানান, কেউ যদি অভিযোগ করে তাহলে আমরা তদন্ত করে দূর্নীতি প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিবো।



